বাংলা গল্প — প্রিমিয়াম রিডিং

পড়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে…

নদীর ওপারে এক টুকরো আলো

একটি বিস্মৃত গ্রামের কথা, একটি পুরনো নৌকার কথা, আর এক মেয়ের স্বপ্নের কথা যে স্বপ্ন দেখেছিল নক্ষত্র ছোঁয়ার।

নীলুফার বেগম
গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
নদীর পারে সন্ধ্যার আলো

ছবি: Unsplash | নদীর তীরে সোনালি আলোর মায়া

মায়ের হাত ধরে প্রথমবার নদী পার হয়েছিল মেঘলা। বাঁশের সাঁকো কাঁপছিল, পায়ের নিচে জল ছলছল করছিল, আর দূরে কোথাও একটা বক ডাকছিল। সেদিন সে বুঝতে পারেনি নদীর ওপারে কী আছে। শুধু জানত — মা যেখানে যান, সেখানেই পৃথিবী।

বছর পনেরো পরে আজ সে একা। একই নদী, একই বাঁশের সাঁকো, কিন্তু মা নেই। বকটা সম্ভবত আজও আছে কোথাও — ঐ ঝাউবনের পেছনে, যেখানে রোদ কম পড়ে, যেখানে জোনাকিরা রাতে জমায়েত হয়।

প্রথম রাত

সন্ধ্যার আগেই মেঘলা পৌঁছে গিয়েছিল কাকিমার বাড়ি। ছোট্ট একটা উঠোন, কোণে একটা তুলসীগাছ, চালের উপরে কাকের বাসা। দরজাটা খোলাই ছিল, যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিল।

রাতে ঘুম আসে না। ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকে সে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ। ঝিঁঝিপোকার ডাক। আর দূর থেকে ভেসে আসে নদীর গন্ধ — মাটি আর শেওলা মেশানো সেই পুরনো পরিচিত গন্ধ।

নদী কখনো মরে না। শুধু রাস্তা বদলায়। মানুষও তাই — হয়তো আমরা শুধু রাস্তা বদলাই, নদীর মতো।

মেঘলার ডায়েরি, পৃষ্ঠা ৪৭

সকালের আলো

ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখে কাকিমা উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছেন। রোদ তখনো পুরোপুরি আসেনি, আকাশটা হালকা গোলাপি। কাকিমা বলেন, "ঘুম হলো?" মেঘলা বলে, "হলো।" দুজনেই জানে, এটা মিথ্যা।

ভোরের আলোয় গ্রামীণ পথ
গ্রামের পথে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ে শিশিরের উপর দিয়ে

নৌকার গল্প

সেই পুরনো নৌকাটা এখনো আছে। ঘাটের কাছে বাঁধা, জলে আধেক ডোবা। মাঝিকে চেনে না মেঘলা — নতুন কেউ হবে। পুরনো মাঝি রশিদ কাকা বছর দুই আগে মারা গেছেন। তার নৌকা কিন্তু রয়ে গেছে — যেন রশিদ কাকার স্মৃতিটা ধরে রেখেছে।

মেঘলা নৌকায় উঠে বসে। নতুন মাঝি কিছু বলে না, শুধু বৈঠা টানে। নদীর মাঝখানে এসে সে একবার পেছনে তাকায় — কাকিমার বাড়িটা ছোট হয়ে গেছে, গাছের আড়ালে প্রায় মিলিয়ে গেছে। সামনে তাকায় — ওপারে একটা আলো জ্বলছে। ছোট্ট, কাঁপছে, কিন্তু জ্বলছে।

ফেরার পথ

কয়েকদিন পরে, ফেরার দিন সকালে, মেঘলা একটা কাজ করে। মায়ের পুরনো শাড়িটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখে। কাকিমাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, "আবার আসব।" কাকিমা বলেন, "আয়।" একটু থেমে বলেন, "নদী কিন্তু অপেক্ষা করে।"

ফেরার নৌকায় বসে মেঘলা ভাবে — নদীর ওপারের সেই আলোটার কথা। সেটা কি আজও জ্বলছে? হয়তো জ্বলছে। হয়তো সেটাই মায়ের আলো — যে আলো কখনো নেভে না, শুধু একটু দূরে সরে যায়, যাতে আমরা খুঁজতে বের হই।

নদীর জল সেদিন অস্বাভাবিক শান্ত ছিল। বক উড়ছিল। ঝাউ গাছের মাথায় বাতাস খেলছিল। আর মেঘলার চোখে জল — কিন্তু বুকে এক অদ্ভুত হালকা অনুভূতি। যেন অনেকদিন পরে কোথাও বাড়ি ফিরছে সে। যে বাড়ি নদীর মাঝখানে, যেখানে মা থাকেন।

ট্যাগ
#ছোটগল্প #বাংলাসাহিত্য #নদী #মা #গ্রামবাংলা #স্মৃতি
লেখক পরিচিতি
নীলুফার বেগম
নীলুফার বেগম ঢাকার একজন তরুণ লেখিকা। তিনি মূলত ছোটগল্প ও প্রবন্ধ লেখেন। প্রকৃতি, স্মৃতি এবং মানবসম্পর্ক তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ 'জলের কাছে বাড়ি' ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে।