গল্প
গল্প

ভাঙা দাওয়াত

“আমার স্বামী নিজের পুরোনো প্রেমিকাকে আমাদের নতুন বাসার দাওয়াতে ডাকল… আমি যখন বললাম এটা স্বাভাবিক না, তখন সে শুধু ঠান্ডা গলায় বলেছিল— ‘ভালো না লাগলে দরজা খোলা আছে।’ সেদিন আমি চিৎকার করিনি… কান্নাও করিনি। শুধু এমন একটা উত্তর দিয়েছিলাম, যেটা শুনে তার মুখের রঙ বদলে গিয়েছিল…” নতুন ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের ঠান্ডা মেঝেতে বসে ছিলাম আমি। চুলগুলো এলোমেলো করে খোঁপা করা, গায়ে পুরোনো একটা সুতির কামিজ… হাতজোড়া ডিটারজেন্ট আর ময়লায় ভরা। বেসিনের নিচের পাইপটা সকাল থেকে পানি চুঁইয়ে পুরো রান্নাঘর ভাসিয়ে ফেলছিল। আমি একটা রেঞ্চ হাতে নিয়ে কোনোমতে ঠিক করার চেষ্টা করছিলাম। ঠিক তখনই… ধাম করে দরজা লাগার শব্দে পুরো ফ্ল্যাট কেঁপে উঠল। দেয়ালে টাঙানো ফ্রেমগুলো পর্যন্ত দুলে উঠল। আমি নিচ থেকে মাথা বের করতেই দেখলাম— রায়হান দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সেই পরিচিত কঠিন ভাব… যেন অফিসের বস কর্মচারীকে জেরা করতে এসেছে। দুই হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে সে ঠান্ডা গলায় বলল, — “মেহরীন, শনিবারের ব্যাপারে আমাদের কথা বলা দরকার।” শনিবার মানে আমাদের নতুন বাসার গৃহপ্রবেশের দাওয়াত। গত এক মাস ধরে এই একটা দিনের জন্য কত কিছু করেছি আমি! কত রাত না ঘুমিয়ে পর্দা মিলিয়েছি, দেয়ালের রং বেছেছি, নিজের হাতেই কুশনের কাভার সেলাই করেছি… আমি হাত মুছতে মুছতে তাকালাম তার দিকে। — “কী হয়েছে শনিবারে?” সে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে এমন একটা ভাব নিল যেন খুব যুক্তির কথা বলতে যাচ্ছে। — “আমি একজনকে ইনভাইট করেছি… ওর আসাটা আমার জন্য খুব ইম্পর্ট্যান্ট। তাই চাই তুমি সেদিন কোনো সিন ক্রিয়েট করবা না। ম্যাচিউরলি হ্যান্ডেল করবা। না পারলে… সেটা কিন্তু বড় সমস্যা হবে।” আমার বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠল। আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, — “কে?” সে এক সেকেন্ডও দেরি করল না। — “তৃষা।” শব্দটা শুনে মনে হলো কেউ আমার বুকের ভেতর কাঁচ ভেঙে ফেলল। তৃষা। তার এক্স ফিয়ঁসে। যার নামটা আমাদের বিয়ের পরও কখনো পুরোপুরি হারায়নি। যে মেয়ের ফেসবুক পোস্টে আজও রায়হান রিঅ্যাক্ট দেয় “পুরোনো বন্ধু” বলে। যার ছবি দেখলে সে এখনও চুপচাপ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। যার নামটা আমাদের সংসারের ভেতর এমনভাবে মিশে ছিল… যেন আগুন নিভে যাওয়ার পরও ধোঁয়া রয়ে গেছে। আমার হাত থেকে রেঞ্চটা টাইলসে পড়ে টুং করে শব্দ করল। আমি ধীরে বললাম, — “তুমি তোমার পুরোনো প্রেমিকাকে আমাদের বাসার অনুষ্ঠানে ডাকছ?” রায়হান কাঁধ ঝাঁকাল। — “হ্যাঁ। আমরা এখন খুব ভালো বন্ধু। আর যদি এটা নিয়ে তোমার সমস্যা হয়, তাহলে সেটা তোমার ইনসিকিউরিটি। আমার না।” তার প্রতিটা শব্দ ছিল অপমানের মতো। এটা আলোচনা ছিল না… এটা ছিল চাপ। সে আরও কাছে এসে বলল, — “আমি চাই তুমি একটু ক্লাসি বিহেভ করো। পারবা তো?” সে হয়তো আশা করেছিল আমি চিৎকার করব। কাঁদব। ঝগড়া করব। কিন্তু আমি শুধু হেসেছিলাম। খুব ছোট্ট, শান্ত একটা হাসি। এতটাই শান্ত যে সে নিজেই অস্বস্তিতে পড়ে গেল। — “অবশ্যই। তুমি যেহেতু এত চাইছ… উনি অবশ্যই আসবেন।” রায়হান ভুরু কুঁচকে তাকাল। — “মানে? এত সহজে মেনে নিলা?” আমি নরম গলায় বললাম, — “তোমার গুরুত্বপূর্ণ মানুষ… আপ্যায়ন তো করতেই হবে।” সে কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে রুমে চলে গেল। যাওয়ার সময় মোবাইল বের করল। হয়তো তৃষাকে মেসেজ দিচ্ছে— “সব কন্ট্রোলে আছে।” দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই আমি ফোনটা হাতে নিলাম। সবার আগে কল দিলাম সাদিয়াকে। আমার কলেজ লাইফের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো গলা ভেসে এল, — “হ্যালো? কী হয়েছে?” আমি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললাম, — “তোর বাসার গেস্টরুমটা খালি আছে?” সাদিয়া একদম চুপ। তারপর ধীরে বলল, — “মেহরীন… কী হয়েছে?” আমি জানালার বাইরে তাকালাম। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। — “শনিবারের পর হয়তো কিছুদিন থাকতে হবে।” ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর খুব আস্তে একটা উত্তর— — “চলে আয়।” পরদিন থেকে রায়হান যেন অন্য মানুষ। অফিস থেকে বারবার ফোন করছে— “কাবাব নাকি রোস্ট ভালো হবে?” “ফুল সাদা নাকি লাল?” “প্লেলিস্টটা শুনে দেখো তো!” তার চোখেমুখে এমন উত্তেজনা… যেন এটা আমাদের সংসারের অনুষ্ঠান না, তার ব্যক্তিগত কোনো সাফল্য। আর আমি? আমি আলাদা একটা তালিকা বানালাম। আমার দরকারি জিনিসের তালিকা। আমার জামাকাপড়। ল্যাপটপ। মায়ের দেওয়া সোনার চুড়ি। বাবার পুরোনো ঘড়ি। নিজের টাকায় কেনা কফি মেশিন। আমার বইগুলো। এমনকি ড্রয়িংরুমের ছোট্ট কাঠের চেয়ারগুলোও… যেগুলোর কভার আমি নিজের হাতে বানিয়েছিলাম আর রায়হান হেসে বলেছিল— “গ্রামের মতো লাগে।” সেদিন রাতে আমি চুপচাপ নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা সরিয়ে নিলাম। বাসার সব খরচ হিসাব করে নিজের অংশ মিটিয়ে দিলাম। যেন পরে কেউ বলতে না পারে— “আমি ওর ঘাড়ে বসে খেয়েছি।” রাতের দিকে রায়হান ড্রয়িংরুমে লাইট ঝুলাচ্ছিল। খুব খুশি গলায় বলল, — “এই লাইটগুলো ধরো তো।” আমি এগিয়ে গিয়ে ধরলাম। আমরা একসাথে টেবিল সাজালাম। শরবতের গ্লাস ধুয়ে রাখলাম। নতুন টেবিলক্লথ বিছালাম। সে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছিল। — “দেখো মেহরীন… এই বাসা থেকে আমাদের নতুন জীবন শুরু হবে।” আমি দেয়ালের দিকে তাকালাম। এই দেয়ালে আমার হাতের রং লেগে আছে। এই ঘরে আমার ঘাম, সময়, স্বপ্ন সব মিশে আছে। আমি ধীরে বললাম, — “হ্যাঁ… শনিবারটা সত্যিই একটা টার্নিং পয়েন্ট হবে।” রাতে হঠাৎ সে মোবাইল দেখে হেসে উঠল। — “তৃষা আসছে। আর বাসার জন্য নাকি অনেক সুন্দর একটা গিফটও আনছে।” আমি পানির গ্লাস নামিয়ে বললাম, — “বাহ। খুব ভালো।” সে এবার একটু কৌতূহলী চোখে তাকাল। — “তুমি অদ্ভুত রকম শান্ত।” আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম, — “তুমিই তো বলেছিলে ম্যাচিউর হতে।” শনিবার। বিকেল চারটা। পুরো ফ্ল্যাট মানুষে ভর্তি। হাসির শব্দ, কাঁচের গ্লাসের টুংটাং, বিরিয়ানির গরম মসলার গন্ধ… চারদিকে উৎসবের আমেজ। কিন্তু মানুষের ফিসফাসও থামছিল না। — “শুনছিস? ওর এক্স নাকি আসতেছে!” — “ভাবী রাজি হলো কীভাবে?” — “এই রায়হান ভাইও না…” যখনই কেউ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছে, আমি শুধু হেসেছি। — “সংসার টিকিয়ে রাখতে কিছু জিনিস মানিয়ে নিতে হয়।” সাদিয়া পাশে এসে দাঁড়াল। আমার চোখের দিকে তাকিয়েই সব বুঝে গেল। ধীরে ফিসফিস করে বলল, — “এটা তোর অনুষ্ঠান না মেহরীন… এটা ওর।” আমি ঠান্ডা শরবতে চুমুক দিয়ে বললাম, — “তাই তো… শেষ পর্যন্ত উপভোগ করতে দে।” পাঁচটার পর থেকে রায়হান অস্থির হয়ে উঠল। বারবার শার্ট ঠিক করছে। ঘড়ি দেখছে। দরজার দিকে তাকাচ্ছে। যেন পুরো পার্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এখনও আসেনি। তারপর… টিং টং। কলিংবেলের শব্দে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই দরজার দিকে তাকাল। রায়হান প্রায় দৌড়ে এগিয়ে গেল দরজা খুলতে। কিন্তু আমি তার আগেই সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। হালকা হেসে বললাম, — “আমি খুলছি।” পেছনে ত্রিশজন মানুষ নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে। আর দরজার ওপাশে… সেই মেয়ে, যাকে দিয়ে আমার স্বামী আমাকে অপমান করতে চেয়েছিল। আমি দরজার হাতলে হাত রাখলাম। ধীরে দরজাটা খুললাম। আর তৃষার মুখটা দেখেই… আমি ঠিক বুঝে গেলাম, প্রথম কথাটা কী হবে। চলবে… ভাঙা দাওয়াত [লেখক #গল্প_ঘর ]...

পড়ার অগ্রগতি
সুন্দর গল্প

Post a Comment

0 Comments